মুভি রিভিউ

আয়নাবাজি | একটি সম্ভাবনার অপমৃত্যু

শুক্রবার, ২৮ অক্টোবর ২০১৬ | ৩:১৭ পূর্বাহ্ণ | 1159 বার

Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterShare on LinkedInPrint this page

ছবি: আয়নাবাজি
প্রযোজক: কন্টেন্ট ম্যাটারস লিমিটেড, হাফ স্টপ ডাউন
চিত্রনাট্যকার: গাউসুল আলম শাওন ও অনম বিশ্বাস
চিত্রগ্রাহক: রাশেদ জামান
অভিনয়: চঞ্চল চৌধুরী, মাসুমা রহমান নাবিলা, পার্থ বড়ুয়া


আয়নাবাজি। সাম্প্রতিক সময়ের একটি বাংলাদেশী ছবির নাম। আলোচিতও বটে। যদিও বলা হয়েছিল এটি শতভাগ একটি মৌলিক ছবি। কিন্তু মুক্তি পরবর্তী দেখা যায়, কোরিয়ান ছবি ‘টাম্বেলউড’ থেকে ধার করা চরিত্র নিয়ে ছবিটির গল্প দাঁড় করানো হয়েছে। ধার না বলে এটাকে চুরি বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না। কারণ অন্যের ক্রিয়েটিভির ক্রেডিট যদি না দিতে চান তাহলে সেটাকে ‘চুরি’ বলা অযৌক্তিক নয়।

aynabaji
অবশ্য এটা নিয়ে মতবিরোধ থাকতেই পারে। এতদ্বসত্ত্বেও দর্শক ছবিটি গ্রহণ করেছে। ছবিতে আহামরি কিছু থাকুক আর না-ই থাকুক, দর্শক চাহিদা যে পরিচালক অমিতাভ রেজা মেটাতে পেরেছেন সেটা অনস্বীকার্য। এই চাহিদা মেটানোর দুটি কারণ আছে। প্রথমত, অমিতাভ রেজা মূলত বিজ্ঞাপন নির্মাতা। তার তৈরি বিজ্ঞাপনগুলোর বেশিরভাগ দর্শক সমাদৃত। অনেক সাধনার পর একটি ছবি নির্মাণ করেছেন। স্বভাবতই দর্শকের কাছে তার বিজ্ঞাপনের মতোই চমক হিসেবে ছবিটি হাজির হওয়ার কথা। আদপে হয়েছেও তাই। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, এ ছবির অকারণ প্রচারণা। স্বপ্রণোদিত হয়ে ছবিটি দেখতে সোশ্যাল মাধ্যমে যেভাবে প্রচারণা চালানো হয়েছে, তাতে নির্মাতার জন্য পোয়াবারোই হয়েছে। ফলাফল, তিন সপ্তাহ শেষে ছবির ব্যবসা বাম্পার হিট। মুক্তির প্রথম সপ্তাহে ২০ হল থেকে তৃতীয় সপ্তাহে সেটা প্রায় ৭০ ছাড়িয়ে গেছে। তবুও যেন দর্শকের আগ্রহ কমছে না। কিন্তু শেষতক এসে পরাজিত হয়েছে আয়নাবাজি।

কী একটু খটকা লাগছে মনে? বাম্পারহিট একটি ছবি মুক্তির তৃতীয় সপ্তাহ পর এসে কীভাবে পরাজিত হয়? এতে আয়নাবাজি পরাজিত হয়নি। পরাজিত হয়েছে দর্শক। যারা অসংখ্য মানুষের ভিড় ঠেলে হয়রানির শিকার হয়ে নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে সিনেমা হলে ছবিটি দেখতে গিয়েছিলেন, তারা পরাজিত হয়েছে। কিন্তু কীভাবে? বিষয়টি একটু খোলাসা করা যাক।
aynabaji-2
২০০৬ সালে গিয়াসউদ্দিন সেলিম পরিচালিত ‘মনপুরা’র পর ২০১৬ সালে আয়নাবাজি’ই দর্শক নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছিল। হুমড়ি খেয়ে পড়ার মতো অবস্থা হয়েছিল এ দুটি ছবির ক্ষেত্রেই। মনপুরার সময় অনলাইনের সুবিধা ছিল না বা থাকলেও সেটা ছিল একেবারেই সীমিত। কিন্তু আয়নাবাজির ক্ষেত্রে তা ব্যতিক্রম। অনলাইন প্রচারণার সুবিধা নিয়ে বাজিমাত করেছিল ছবিটি। ব্যবসায়িকভাবে শুধু সফল বললে ভুল হবে। বরং বলা যেতে পারে অপ্রত্যাশিত সফলতা পেয়েছে আয়নাবাজি। কথিত আছে, ৬০ লাখ টাকা বাজেটের এ ছবি আয়ের দিক থেকে নাকি ১০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। যদিও এ বিষয়ে প্রযোজনা সংস্থা কন্টেন্ট ম্যাটারস লিমিটেড ও হাফ স্টপ ডাউন থেকে স্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত দেয়া হয়নি। শুধু ছবির খরচের বিষয়টি তারা উল্লেখ করেছেন। তার পরিমাণ বলেছেন দেড় কোটি টাকা। কিন্তু আদপে দেড় কোটি টাকা এ ছবিতে খরচ হয়েছে কিনা সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ। এতদ্বসত্ত্বেও ছবিটি নিয়ে মাতামাতি ছিল উল্লেখযোগ্য। তাতেও যেন মন ভরছিল না প্রযোজনা সংস্থার।

aynabaji-1
তুমুল দর্শক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিক লোভে মোবাইল ফোন অপারেটর রবির কাছে ছবিটি বিক্রি করে দিল। রবিও ব্যবসায়িক স্বার্থ কাজে লাগিয়ে তাদের নিজস্ব অনলাইন টিভিতে মাত্র ৩৬ টাকার বিনিময়ে ছবিটি দেখার সুযোগ করে দিল তাদের সিম ব্যবহারকারীদের। ব্যস আর যায় কোথায়? পাইরেসি নামক হিংস দানব আক্রমণ করে বসল আয়নাবাজিকে। একটি স্বপ্নকে। একটি সম্ভাবনাকে।

সিনেমা শিল্প যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে তখন আয়নাবাজির মতো একটি ছবি দর্শকদের হলমুখী করছে, ঠিক তখন বেনিয়াদের উচ্চাবিলাসিতার কাছে পরাজয় হল একটি সম্ভাবনার। তিনটি সপ্তাহ যারা কষ্ট করে সিনেমা হলে গিয়ে ছবিটি উপভোগ করেছেন, তাদের মনে দগদগে ক্ষত সৃষ্টি করে দিল প্রযোজনা সংস্থা! অনেকে এজন্য রবিকে দায়ী করছেন। আবারও কেউ কেউ পাইরেসি চোরদের। প্রযোজনা সংস্থার লোভাতুর দৃষ্টিকে কটাক্ষ করতেও অনেকে ছাড়েননি। কিন্তু সত্যিকার অর্থে এ পাইরেসির জন্য দায়ী কারা? শিয়ালের ডেরায় বসে আপনি যদি মুরগির খোঁয়াড়ের দরজা খুলে দেন তাহলে এর জন্য কার শাস্তি পাওয়া উচিত? শিয়ালের নাকি মুরগির মালিকের? প্রশ্নটা এখানেই।

aynabaji-5
আপাত দৃষ্টিতে আয়নাবাজি পাইরেসির জন্য মোবাইল ফোন অপারেটর রবির কোনো দোষ নেই বলে মনে হয়। কারণ তারা টাকার বিনিময়ে ছবিটি প্রদর্শনের জন্য কিনে নিয়েছিল। বরং দায়ী তারাই, যারা পাইরেসি হবে এটা জানা সত্ত্বেও একটি মোবাইল ফোন অপারেটরের কাছে ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করেছে। শুধু বাণিজ্যিক লোভে এবং নিজেদের স্বার্থের কথা চিন্তা করে, হল বাঁচানো কিংবা সামগ্রিক চলচ্চিত্র শিল্পের স্বার্থ নিমিষেই ভুলে গেল?

আয়নাবাজির ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। ছবির পরিচালক অমিতাভ রেজা চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘শেকড়, দেশাত্মবোধ, মুক্তিযুদ্ধ, জাতি- এসব নিয়ে আমার কিছু যায় আসে না। আমি টাকার জন্য কাজ করি, এতে কোনো সন্দেহ নেই।’ এমন কথা বলার পরও দর্শক কিন্তু ক্ষমা করে দিয়েছিল তাকে। কিংবা তার কাজের মহত্বকে বড় করে দেখে আয়নাবাজির প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু অর্থের কাছে তিনি যে সত্যিই আপাদমস্তক হেরে যাবেন, সেটা ঘুণাক্ষরেও বোধ হয় টের পাননি কেউ।

দৈনিক যুগান্তরের সৌজন্যে

২০১১-২০১৭ | টক্কিজবিডি ডটকম'র কোনো সংবাদ বা ছবি অন্য কোথাও প্রকাশ করবেন না

Design by: Web Q BD | Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!